আওয়ামী লীগ দোসর সওজ কর্মকর্তা শাহনুর রশিদ এখন শতকোটি টাকার মালিক
লিটন আলী
আপলোড সময় :
২৪-০৬-২০২৬ ০৪:৪৯:৫৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৪-০৬-২০২৬ ০৪:৪৯:৫৪ অপরাহ্ন
শাহনুর রশিদ
সর্বশাকুল্যে বেতন পান ৫৪ হাজার কিন্তু থাকেন আলিশান অট্টালিকায়, জীবনযাপন করেন রাজকীয় কায়দায়। রাজনৈতিক প্রভাবও কম নয়, তার সাথে আওয়ামী লীগ-বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের পরিচয়।
মো.শাহনুর রশিদ, সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরি করেন দিনাজপুরের সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরে।
এই কর্মকর্তার রাজধানীর খিলগাঁও ও পল্লবীতে রয়েছে কোটি টাকা মূল্যের একের অধিক ফ্ল্যাট। এছাড়াও দিনাজপুর ও রংপুরে গড়েছেন কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ। চাকরি, কৃষি ও দোকান ভাড়া থেকে প্রাপ্ত অর্থ থেকে এ সম্পদের মালিক হয়েছে বলে তিনি আয়কর নথিতে উল্লেখ করেন।
সম্প্রতি মো. শাহনুর রশিদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, দুর্নীতির মাধ্যমে নামে-বেনামে সম্পদ গড়ে তোলার আমলনামা এখন দুদকের হাতে। দুদক সূত্র জানায়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে অবৈধ সম্পদের সন্ধান পেয়েছে দুদক। মো. শাহনুর রশিদ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হলেও তার চালচলন, কাজকর্ম ও আচার-আচরণ সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতাদের মতন। তিনি পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে দুর্নীতির মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
এছাড়াও তার স্ত্রী শাবানার নামেও গড়েছেন অঢেল অবৈধ সম্পদ। দুদকের অনুসন্ধান শুরুর পর সম্পদ জব্দ হওয়ার ভয়ে ব্যাংক থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা উত্তোলন করে নিজের ও নিকট আত্মীয়দের নিকট রেখে দেন তিনি। অনৈতিক ও বেআইনি উপায়ে অন্যায় সুবিধা আদায় বা প্রদানই হলো দুর্নীতি। আর এই দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক ও বাস্তব রূপ দিয়েছেন মো. শাহনুর রশিদ। তিনি ক্ষমতার অপব্যবহারে ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের জন্য নানাবিধ অনৈতিক কাজকে অফিসিয়ালি কাজ মনে করে গড়ে তুলেছেন দুর্নীতির শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
সূত্র জানায়, দিনাজপুরের সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহনুর রশিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে ঠিকাদারদের যোগসাজশে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারসহ বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে দিনাজপুরের পুলহাট থেকে খানপুর পর্যন্ত সড়কের দু’পাশে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা স্থাপনার পিছনে রয়েছে সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহনুর রশিদের অদৃশ্য হাত। এই সকল অবৈধ স্থাপনা থেকে তিনি প্রতিনিয়ত মাসোহারা পেয়ে থাকেন। প্রতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং কাজের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ না করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের মূল কারিগর এই প্রকৌশলী।
দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে প্রকৌশলী মো. শাহনুর রশিদের নামে দুর্নীতির অভিযোগ দাখিল করে জৈনিক ব্যাক্তি। অভিযোগটি আমলে নিয়ে অনুসন্ধানের জন্য দিনাজপুর জেলা অফিসকে নির্দেশ দেয় দুদক। সে মোতাবেক দিনাজপুর জেলা অফিস অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য রেকর্ডপত্র ও তথ্যাদি সরবরাহের জন্য নোটিশ দেয় কিন্তু এই অনুসন্ধান বন্ধ করতে রাজনৈতিক তৎপরতা চালায় সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহনুর রশিদ।
শাহনুর রশিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, সরকারি ক্রয় বিধি (পিপিআর) লঙ্ঘন করে দরপত্র আইডি ও শর্তাবলি এমনভাবে তৈরি করেন যাতে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট ছাড়া অন্য কেউ প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারে। এই দরপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং বিনিময়ে প্রতিটি কার্যাদেশ থেকে একটি বড় অঙ্কের কমিশন পকেটস্থ করার বিষয়টি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সদর দপ্তর থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ে ওপেন সিক্রেট হিসেবে পরিচিত।
সূত্র জানায়, উপসহকারী প্রকৌশলী থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর তাঁর দুর্নীতির ব্যাপ্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বর্তমানে তিনি রাতারাতি নিজের খোলস পালটে বিএনপি সমর্থক সেজেছেন। বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং বিশেষ সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুর্নীতি দমন কমিশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, দিনাজপুরের সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহনুর রশিদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়ার একটি অভিযোগ কমিশনে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে প্রাথমিক অনুসন্ধানে অবৈধ সম্পদ অর্জনের হদিস মিলেছে।
এদিকে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের অবস্থিত সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ ময়নুল হাসানের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে প্রধান প্রকৌশলীর স্টাফ অফিসার সৈয়দ হালিমুর রহমান জানান, স্যার এ প্রসঙ্গে কথা বলবেন না।
দিনাজপুরের বিরামপুরে অর্ধ কোটি টাকা মূল্যের ২টি দোকান ও গোডাউন রয়েছে ২০১০ সালের ২৪ আগস্ট ক্রয় করেছেন যাহার দলিল নং-৪৫৯০। বিরামপুর মৌজায় ৩ শতাংশের প্লট জমি ক্রয় করেছেন ২০১০ সালের ১০ অক্টোবর যার দলিল নং-৩১৪৩। দিনাজপুরের বাশঁবাড়িয়া মৌজায় ২০১১ সালের ২২ জুন ক্রয় করেছেন- ৫১.৫ শতাংশ জমি যার দলিল নং-২৮৮৫।
বিরামপুর মৌজায় ২০১১ সালের ২৪ আগস্ট ক্রয় করেছেন ৭.৫ শতাংশ জমি যার দলিল নং-৪০৮৩। বাশঁবাড়িয়া মৌজায় ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর ক্রয় করেছেন ৩৩ শতাংশ জমি যার দলিল নং-৫০৯৯। রংপুরের সাতগাড়া মৌজায় ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি ক্রয় করেছেন ৪.০৮ শতাংশ জমি যার দলিল নং-১২৭৫/১৮। রংপুরের সাতগাড়া মৌজায় ২০২০ সালে ১৪ লাখ ২০ হাজার টাকায় ক্রয় করেছেন প্লট জমি যার দলিল নং- ৮৩৮৮।
বিরামপুর মৌজায় ২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ২৫ লাখ টাকায় ১১.৫ শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন যাহার দলিল নং-৮৭৪। বিরামপুরের কানিকাঠাল মৌজায় ক্রয় করেছেন ৯৭.৫ শতাংশ জমি যার দলিল নং-৩১৭৬। বিরামপুরের কানিকাঠাল মৌজায় ক্রয় করেছেন ৯১.৭৫ শতাংশ জমি যার দলিল নং-৩১৭৭। এছাড়াও ২০২৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর রাজধানীর খিলগাঁওয়ের উত্তর মেরাদিয়ায় ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন এবং পল্লবীর বাউনিয়ায় ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর একটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন যার দলিল নং-৯৮৭৫।
এ প্রসঙ্গে দিনাজপুরের সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহনুর রশিদ মুঠোফোনে বলেন, “কোন অনিয়ম বা অবৈধ পথে নয়, সম্পুর্ন বৈধ পথে সম্পদ অর্জন করেছি”। তবে এ পদে চাকরি করে এত অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক কিভাবে হলেন? এমন প্রশ্নের কোন সদুত্তর প্রদান না করেই কলটি কেটে দেন তিনি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স